ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম | ওযু ভঙ্গের ৭টি কারণ
ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম আমাদের প্রত্যেক মুসলমান ব্যক্তিদের জানা উচিত। শুধু
জানলেই হবে না সঠিকভাবে ওযু করতে হবে কারণ ওযু করার অনেকগুলো ধারাবাহিক নিয়ম
রয়েছে। এই ধারাবাহিক নিয়ম গুলো না জানলে ওযু সঠিকভাবে হবে না।
তাছাড়া ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম জানার পাশাপাশি আমাদের জানতে হবে ওযু ভঙ্গের
৭টি কারণ সম্পর্কে। এজন্য আমি আজকে এই আর্টিকেলটি লিখছি যেনো আপনারা ওযু করার
বিষয়ে সকল তথ্য এখান থেকে পেয়ে যান।
পোস্ট সূচিপত্রঃ ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম | ওযু ভঙ্গের ৭টি কারণ
ওযু সম্পর্কে এই আর্টিকেল থেকে আপনি যা যা শিখতে পারবেন তা এক নজরে দেখে নিন-
ওযু কাকে বলে?
সহজ অর্থে, নামাজ এবং অন্যান্য ইবাদতের জন্য দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ পবিত্র
করার উদ্দেশ্যে হাত, পা, মুখমন্ডল ধৌত এবং মাথা মাসেহ করাকে ওযু বলে।
ব্যাপক অর্থে, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে পবিত্রতা হাসিল করার উদ্দেশ্যে নিয়ত করে
উভয় হাতের আঙ্গুলের মাথা থেকে হাতের কনুই পর্যন্ত ধৌত করা, গড়গড়া সহ কুলি করা,
নাকে পানি দেয়া (রোজা ব্যতীত অন্য সময় গড়গড়া সহ কুলি করা এবং নাকের ভেতরের
নরম স্থান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো) মুখমণ্ডল ধৌত করা এবং মাথা মাসেহ করা ও পায়ের
উভয় গিরা পর্যন্ত ধৌত করাকে ওযু বলে।
ওযু করার প্রয়োজনীয়তা
ওযু করা অবশ্যই প্রত্যেক মুসলমানদের ওপরেই ফরজ আর এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে মহান
আল্লাহতালা ওযুর নির্দেশ প্রদান করেছেন। কোরআন পাঠ করার পূর্বে এবং নামাজ আদায়
করার পূর্বে ওযু করা ফরজ। ইবাদতের জন্য ওযু করার সময়, ওযুর ফরজ সমূহের প্রতি
বিশেষ সতর্কতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে।
কারণ ফরজ সমূহের, যে কোন একটি ফরজ ছুটে গেলে ওযু শুদ্ধ হবে না। তাই ওযু ছুটে গেলে
পুনরায় নতুন করে ওযু করতে হবে এবং ওযুর সুন্নত ও মুস্তাহাব এর দিকেও সতর্ক
দৃষ্টি রাখতে হবে।
আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ বলেছেন- আপনারা যখন ওযু করবেন তখন আপনাদের চুলের
মাথা পরিমাণ যেন শুকনা না থাকে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে চুল পরিমান জায়গা শুকনা
থাকলেও ওযু হবে না।
ওযুর ফরজ কয়টি এবং কি কি?
ওযুর ফরজ সর্বমোট চারটি। যেমনঃ
- মুখমন্ডল ধৌত করা
- উভয় হাত ধৌত করা
- মাথা মাছেও করা
- উভয় পায়ের গিরা পর্যন্ত ধৌত করা
এগুলো বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে নিচে দেওয়া হল-
মুখমন্ডল ধৌত করাঃ সমস্ত মুখমণ্ডল চুলের গোড়া হতে থুতনি পর্যন্ত, এক
কানের লতি হতে অন্য কানের লতি পর্যন্ত ধৌত করতে হবে।
উভয় হাত ধৌত করাঃ দুই হাতের আঙ্গুলের মাথা থেকে কোনোই পর্যন্ত ধৌত করতে
হবে। প্রথমে ডান হাত ধৌত করতে হবে এবং পরে বাম হাত ধৌত করতে হবে।
মাথা মাসেহ করাঃ মাথার চার ভাগের একভাগ মাসেহ করতে হবে।
উভয় পায়ের গিরা পর্যন্ত ধৌত করাঃ পায়ের আঙ্গুলের মাথা থেকে পায়ের গিরা
পর্যন্ত ধৌত করা। মনে রাখবেন পায়ের আঙ্গুলের মাঝখানে যে খালি স্থান রয়েছে সেটি
ভালো করে ধুতে হবে।
ওযুর সুন্নত সমূহ
ওযুর সুন্নত সমূহ সর্বমোট ১৬টি। যেমনঃ
- নিয়ত করা
- বিসমিল্লাহ বলে ওযু শুরু করা
- হাতের আঙ্গুলগুলো খিলাল করা
- উভয়ই হাত কব্জা পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা
- মেসওয়াক করা
- তিনবার গড় গড়ার সাথে কুলি করা
- নাকের ভিতর তিনবার পানি দেওয়া
- সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধৌত করা
- ভিজা আঙ্গুলি দ্বারা দাড়ি খিলাল করা
- উভয় হাত কোনোই সহ তিনবার ধৌত করা
- সমস্ত মাথা একবারও মাসেও করা
- উভয় কান একবার মাসেহ করা
- টাখনু পর্যন্ত উভয় পা তিনবার ধৌত করা।
- পায়ের আঙ্গুলগুলো খিলাল করা।
- এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই অন্য অঙ্গ ধৌত করা
- ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ওযুর কাজ গুলো সম্পন্ন করা
ওযু করার পূর্বে দোয়া এবং নিয়ত
ওযুর দোয়াঃ
ওযুর নিয়তঃ
ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম
চলুন এখন আমরা ওযু করার যে নিয়ম রয়েছে সে নিয়মটি ধারাবাহিকভাবে শিখে আসে-
১) প্রথমে ওযুর নিয়ত করতে হবে যা আমি উপরে দিয়ে দিয়েছি।
২) এরপর দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করতে হবে। অবশ্যই ডান হাত আগে ধুতে
হবে এবং বাম হাত পরে ধুতে হবে। আঙ্গুলের মাঝখানের খালি স্থান গুলোও ভালো ভাবে
ধরতে হবে।
৩) তারপর মুখে পানি দিয়ে তিনবার কুলি করতে হবে। দ্বিতীয়বার যখন মুখে পানি দিবেন
তখন গড়গড়া করে তারপর কুলি করবেন।
৪) এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে নাকের ছিদ্রের ভেতরে দিয়ে নাকের ভেতরের নরম স্থান
পর্যন্ত পরিষ্কার করতে হবে। তবে রোজা থাকা অবস্থায় নাকের ভেতরে বেশি পানি দেওয়া
যাবে না। রোজা থাকা অবস্থায় নাকের মধ্যে পানি দিলে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত দিতে
হবে যেন তা গলার ভেতরে চলে না যায়। নাকের ভেতরে পানি দেওয়ার পর বাম হাতের
কনিষ্ঠ ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তিনবার নাকের ভেতর পরিষ্কার করবেন।
৫) তারপর দুই হাতে পানি নিয়ে তিনবার মুখ ধুতে হবে। সম্পূর্ণ মুখ ভালোভাবে ধুতে
হবে। যেমনঃ কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত, ডান কানের লতি থেকে বাম
কানের লতি পর্যন্ত তিনবার ধুতে হবে। যাদের দাড়ি অত্যন্ত ঘন তাদের দাড়ি খিলাল
করে ভিজিয়ে নিতে হবে।
৬) এখন প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাত তিনবার করে ধুতে হবে। হাতের আঙ্গুলের ডগা
থেকে হাতের কোনোই পর্যন্ত তিনবার করে ধৌত করতে হবে।
৭) হাত ধোয়া শেষ হয়ে গেলে উভয় হাতের কনিষ্ঠা, অনামিকা এবং মধ্যমা আঙ্গুল একত্র
করে মাথার এক চতুর্থাংশ মাসেহ করতে হবে এবং সাথে সাথেই দুই হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল
কানে ঢুকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা কানের পৃষ্ঠদেশে মাসেহ করতে হবে। এরপর উভয়
হাতের পিঠ দ্বারা ঘাড় মাসেহ করতে হবে।
৮) এরপর সর্বশেষে পা ধৌত করতে হবে তিনবার। প্রথমে ডান পা এবং পরে বাম পা। ডান পা
প্রথমে তিনবার টাখনু অর্থাৎ ছোটগিরা থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত ধৌত করতে হবে।
এরপর সেম একইভাবে বাম পা টাখনু অর্থাৎ ছোটগীরা থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত ধৌত
করতে হবে। এই সময় পায়ের আঙ্গুলের মাঝখানের গ্যাপ গুলোতে ভালোভাবে পানি প্রবেশ
করাতে হবে।
ওযু শেষে পড়ার দোয়া
ওযু শেষ করার পর একটি দোয়া পড়তে হবে এবং এ দোয়াটি পড়া সুন্নাত। ওযু শেষ করে
দাঁড়ানোর পরে সূরা ইন্না আনযালনা পড়তে হবে।
এরপর নিচের দোয়াটি আবার পড়তে হবে-
এভাবে আপনি যদি ওযু ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করেন তাহলে আপনার ওযু সঠিকভাবে হবে
ইনশাল্লাহ।
ওযু ভঙ্গের ৭টি কারণ
কোন কোন কারণগুলোর জন্য ওযু ভঙ্গ হয়ে যেতে পারে সেগুলো আমাদের জেনে নেওয়া
দরকার। কারণ ওযু না থাকলে যেহেতু ইবাদত হয় না সেহেতু ওযু কি কি কারণে ভঙ্গ হতে
পারে সেগুলো আমাদের অবশ্যই জানতে হবে।
যে ৭টি কারণে ওযু ভঙ্গ হয়ে যায় সেগুলো নিম্নরূপ নিচে দেওয়া হলঃ
১) যদি শরীরের কোন অংশ থেকে রক্ত অথবা পুঁজ বের হয়ে গড়িয়ে পড়ে তাহলে আপনার
ওযু নষ্ট হয়ে যাবে।
২) পেশাব পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হলে অর্থাৎ মলমূত্র বা বীর্য অথবা
কৃমি ইত্যাদি বের হলে ওযু নষ্ট হয়ে যাবে।
৩) যেকোনো অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়। অর্থাৎ এই
বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে বলা যায়- যখন চিত বা কাত অবস্থায় অথবা কোন বস্তুর উপর
হেলান দিয়ে কেউ ঘুমিয়ে যায় তখন ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়।
৪) যদি মুখ ভরে বমন হয় তাহলে ওজু নষ্ট হয়ে যাবে।
৫) যখন কোন সেন্স থাকবে না অর্থাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে বা পাগল হয়ে গেলে বা
মাতাল হয়ে গেলে ওযু ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৬) নামাজের মধ্যে উচ্চস্বরে হাসাহাসি করলে বা নামাজের মধ্যে শব্দ করে হাসলে ওযু
ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৭) পায়ুপথ অর্থাৎ পেছনের রাস্তা দিয়ে বায়ু নির্গত হলে বা বের হলে ওযু নষ্ট
হয়ে যায়।
উপরের এই সাতটি কারণে যদি ওযু ভঙ্গ হয়ে যায় তাহলে আপনাকে পুনরায় ওযু করে
পবিত্র হতে হবে এবং ইবাদত পালন করতে হবে।
মেয়েদের ওযু করার নিয়ম
ইসলামে ওযুর একটাই নিয়ম অর্থাৎ মেয়েদের ওযু করার নিয়ম এর ক্ষেত্রে আলাদা কোন
পার্থক্য নেই। ছেলেদের এবং মেয়েদের নামাজের পার্থক্য থাকলেও ওযুর যেহেতু
পার্থক্য নেই সেহেতু আপনারা এই আর্টিকেলের নিয়ম অনুযায়ী একইভাবে ছেলেরা এবং
মেয়েরা ওযু করবেন।
ওযু কত প্রকার ও কী কী?
ওযু হচ্ছে ৩ প্রকার। যেমনঃ
- ফরজ
- ওয়াজিব এবং
- মোস্তাহাব।
ফরজ ওযু কাকে বলে?
উত্তরঃ নামাজ শুরু করার আগে পবিত্র হওয়ার জন্য যে ওযু করা হয় সেটাকেই বলা হয়
ফরজ ওযু।
ওয়াজিব ওযু কাকে বলে?
উত্তরঃ পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ এর আগে পবিত্র হওয়ার জন্য যে ওযু করা হয় তাকে
বলা হয় ওয়াজিব ওযু।
মোস্তাহাব ওযু কাকে বলে?
উত্তরঃ গোসল ও ঘুমানোর পূর্বে পবিত্র হয়ে ঘুমানোর জন্য যে ওযু করা হয় সেটাকে
বলা হয় মোস্তাহাব ওযু।
FAQs
ওযু সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন উত্তর জেনে নিন-
প্রশ্নঃ ওযু শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ ওযু শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র হওয়া বা পরিচ্ছন্ন হওয়া।
প্রশ্নঃ ওযু কি শব্দ?
উত্তরঃ ওযু একটি আরবি শব্দ।
প্রশ্নঃ ওযু কি?
উত্তরঃ আল্লাহর উপাসনা করার জন্য পা থেকে মাথা পর্যন্ত পবিত্র হওয়ার যে নিয়ম
রয়েছে সেটাই হচ্ছে ওযু।
প্রশ্নঃ ওযু এর ইংরেজি কি?
উত্তরঃ ওযু এর ইংরেজি হচ্ছে- Ablution।
প্রশ্নঃ ওযু নষ্ট হলে ইবাদত কবুল হবে?
উত্তরঃ আপনার যদি ওযু নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আপনি যতই ইবাদত করেন আপনার ইবাদত কবুল
হবে না কারণ পবিত্রতা ছাড়া ইবাদত কবুল হয় না।
প্রশ্নঃ ওযুর প্রধান কাজ কি?
উত্তরঃ ওযুর প্রধান কাজ হচ্ছে শরীরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা এবং ইবাদতের পূর্বে
নিজেকে প্রস্তুত করা।
প্রশ্নঃ ওযু কেন করা হয়?
উত্তরঃ আল্লাহর নৈকট্যে যাওয়ার পূর্বে নিজেকে পবিত্র করার জন্য ওযু করা হয়।
প্রশ্নঃ তায়াম্মুম কি?
উত্তরঃ তায়াম্মুম হচ্ছে ফরজ গোসল করার একটি বিকল্প ব্যবস্থা।
শেষ আলোচনা
আমি আশা করছি আপনারা ওযু করার ধারাবাহিক নিয়ম এবং ওযু ভঙ্গের সাতটি কারণ জানার
পাশাপাশি এই আর্টিকেল থেকে আরো অনেক তথ্য জানতে পেরেছেন। আপনাদের যদি এই বিষয়ে
আরো কোন তথ্য জানার থাকে তাহলে আমাদের কমেন্টে জানাবেন। ইসলামে পাক পবিত্র থাকা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী।
আর আপনি শুধুমাত্র ওযু করার মাধ্যমেই এই পবিত্রতা রক্ষা করতে পারবেন। তাছাড়া
আপনি ওযু না করলে আপনার কোন ইবাদত কবুল হবে না তাই ইবাদত করে যদি আমলনামা বাড়াতে
চান তাহলে সর্বপ্রথম আপনাকে ওযু ভালোভাবে করা শিখতে হবে।